Main Menu

উচ্চশিক্ষায় ভর্তিতে চ্যালেঞ্জ নতুন শর্ত

একবারের বেশি পরীক্ষা দিতে না পারা বড় বাধা * সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা না থাকায় হয়রানি * দুশ্চিন্তা কাটছে না প্রশ্ন ফাঁস

বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানে দ্বিতীয়বার ভর্তি পরীক্ষা দেয়ার সুযোগ বন্ধ হওয়ায় প্রথমবারেই সাফল্য দেখানোর চাপ নিতে হবে। কিছু প্রতিষ্ঠানে রয়ে গেছে শিক্ষার্থীবান্ধব নয় এমন কিছু নিয়ম। সেসব উতরে যাওয়ার পাশাপাশি প্রশ্ন ফাঁস নিয়েও উদ্বেগ থেকেই গেছে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যে কোনোভাবেই হোক প্রথম সারির প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হতে হবে- আমাদের দেশে সামাজিক ও পারিবারিকভাবে এমন চাপ রয়েছে। এর ওপর ভর্তি পরীক্ষায় নতুন নতুন শর্ত আরোপ এ চাপ আরও বাড়াবে। এজন্য গৎবাঁধা পড়াশোনা পদ্ধতি থেকে বেরিয়ে এসে সৃজনশীলতাকে উৎসাহিত করার পরামর্শ দিয়েছেন তারা। সেই সঙ্গে অতিপ্রত্যাশা না করার জন্য অভিভাবকদের আহ্বান জানিয়েছেন।

বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁচ বছরের ভর্তি পরীক্ষার ফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিভিন্ন ইউনিটে ৮০ থেকে ৮৫ ভাগ শিক্ষার্থী ভর্তি পরীক্ষায় ফেল করেছে। এসব শিক্ষার্থী ন্যূনতম পাস নম্বরও (যেমন ১২০ নম্বরের লিখিত পরীক্ষায় ৪৮) পায়নি। এ পরিস্থিতিতে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকে জিপিএ-৫ পেয়েও শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি নিয়ে রয়েছে হতাশা। শহরের শিক্ষার্থীরা টাকা খরচ করে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পেলেও গ্রামের শিক্ষার্থীদের অনেকেরই শিক্ষাজীবনের ইতি ঘটছে উচ্চমাধ্যমিকে। এ অবস্থায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেয়ার পরামর্শও দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

এ বিষয়ে বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. সৈয়দ মঞ্জুরুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, ‘বাচ্চাদের ওপর কোনো কিছু চাপিয়ে দেয়া উচিত নয়। শিক্ষা হতে হবে আনন্দের সঙ্গে। কী ফল অর্জন করল, তার থেকে গুরুত্বপূর্ণ হওয়া উচিত কতটুকু জ্ঞান অর্জন হল, সেই বিষয়ে খেয়াল রাখা।’ কোচিং বিষয়ে তিনি বলেন, ‘কোচিং সমূলে উৎপাটন করতে হবে। এটি এখন শহর থেকে গ্রামেও ছড়িয়ে পড়ছে, যা অত্যন্ত ভয়াবহ ব্যাপার।’ উচ্চমাধ্যমিকে ভর্তির ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক বিষয়ে প্রশ্ন প্রণয়ন সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘অবশ্যই প্রাসঙ্গিক বিষয়ে প্রশ্ন প্রণয়ন করতে হবে।’ তবে উচ্চশিক্ষায় আগ্রহী সবারই সাধারণ জ্ঞান থাকা উচিত বলে মনে করেন এ শিক্ষাবিদ। এছাড়া যে কোনোভাবেই হোক প্রশ্ন ফাঁস বন্ধ করার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।

বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা পদ্ধতি বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পদ্ধতিগত জটিলতা, সমন্বয়হীনতার অভাব, কোচিং ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্য, মফস্বল ও শহরের সুযোগ-সুবিধার তারতম্য এবং প্রশ্নপদ্ধতি প্রণয়নে এইচএসসি সিলেবাসকে কম গুরুত্ব দেয়ায় শিক্ষার্থীদের নানামুখী ভোগান্তির সম্মুখীন হতে হবে। বিগত বছরগুলোর অভিজ্ঞতার আলোকে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এসব কারণে সবচেয়ে বেশি সমস্যার সম্মুখীন হবে মফস্বলের শিক্ষার্থীরা।

এ বছর মেডিকলে ভর্তির ক্ষেত্রে যোগ হয়েছে নতুন শর্ত। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, নতুন নিয়ম অনুযায়ী একজন শিক্ষার্থী মোট দুইবার ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিতে পারবে। এজন্য মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক মিলিয়ে মোট জিপিএ-১০ এর মধ্যে জিপিএ-৯ পেতে হবে। আর কোনো শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হোক বা না হোক, দ্বিতীয়বার পরীক্ষায় অংশ নিলে তার প্রাপ্ত নম্বর থেকে ৫ নম্বর কাটা হবে। আগে কোনো নম্বর কাটা হতো না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দ্বিতীয়বার ভর্তি পরীক্ষার সুযোগ বন্ধের পর বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ই এমন সিদ্ধান্তের দিকে যাচ্ছে। এরই মধ্যে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় দ্বিতীয়বার ভর্তি পরীক্ষার সুযোগ বন্ধ করে দিয়েছে। নতুন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত সাত সরকারি কলেজেও দ্বিতীয়বার ভর্তি পরীক্ষা না নেয়ার সিদ্ধান্ত দিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। এমন সিদ্ধান্ত নেয়ার বিষয়ে আলোচনা চলছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়সহ বেশ ক’টি বিশ্ববিদ্যালয়ে।

ভর্তি পরীক্ষা পদ্ধতি বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, পদে পদে হয়রানির শিকার হতে হয় শিক্ষার্থীদের। ভোগান্তির শুরু হয় আবেদন করা থেকেই। প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য শিক্ষার্থীদের আলাদাভাবে আবেদন করতে হয়। সীমিত আসন থাকায় প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়েই আবার একাধিক ইউনিটে আবেদন করতে বাধ্য হয় শিক্ষার্থীরা। এতে করে হয়রানির সঙ্গে আর্থিক চাপও পোহাতে হয়।

দেশের প্রধান তিনটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশ্ন পর্যালোচনা করে দেখা যায়, প্রশ্নে এমন কিছু বিষয় আনা হয়, যার সঙ্গে এইচএসসির সিলেবাসের ন্যূনতম সম্পর্ক নেই। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে রাজধানী ও দেশের বিভিন্ন স্থানে গড়ে উঠেছে কোচিং সাম্রাজ্য। শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে হাতিয়ে নেয়া হচ্ছে কোটি কোটি টাকা। কোচিংকে নিরুৎসাহিত করতে দ্বিতীয়বার ভর্তি পরীক্ষা বন্ধের উদ্যোগ নিলেও শিক্ষার্থীরা কোচিংবিমুখ হচ্ছে না। তারা বরং একাদশ শ্রেণী থেকেই কোচিং সেন্টারের পথে হাঁটা শুরু করেছে। একদিকে ভর্তি আবেদনের খরচ, অন্যদিকে কোচিংয়ে পড়ানোর জন্য অতিরিক্ত অর্থ জোগাতে হিমশিম খায় অসচ্ছল শিক্ষার্থীরা।

পরীক্ষা নিয়েও তৈরি হয় নানা ভোগান্তি। কারণ বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ভর্তির জন্য পৃথক তারিখ নির্ধারণ করে। এর ফলে ভর্তি পরীক্ষা দিতে শিক্ষার্থীদের দেশের নানা প্রান্তে ছুটে বেড়াতে হয়। ছাত্ররা অভিভাবক ছাড়া পরীক্ষা দিতে গেলেও নিরাপত্তাজনিত কারণে সমস্যায় পড়ে ছাত্রীরা। সমন্বিত ভর্তি প্রক্রিয়া চালু করা গেলে এমন হয়রানি কমে আসবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

নানা সমস্যার মধ্যে যে ভর্তিযুদ্ধে শিক্ষার্থীরা অবতীর্ণ হয়, তাতেও থাকে নানা বৈষম্য। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সমন্বিত ‘ঘ’ ইউনিটে মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থীদের জন্য ৫০টির মতো আসন থাকে। যেখানে বিজ্ঞান বিভাগ ও ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগের জন্য আসন থাকে এক হাজার। একই প্রশ্নে পরীক্ষা দেয়া সত্ত্বেও এ রকম আসন বণ্টনকে বৈষম্য বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থাও অনেকটা একই রকম।

এছাড়া জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের সংখ্যা অনুযায়ী একই ইউনিটে বিভিন্ন শিফটে পরীক্ষা হয়। প্রতিটি শিফটের জন্য আলাদা প্রশ্ন প্রণয়ন করা হয়। কোনো শিফটে প্রশ্ন সহজ হয়, কোনোটায় কঠিন। ফলে যে শিফটে প্রশ্ন সহজ হয়, সেই শিফট থেকে বেশিসংখ্যক ভর্তির সুযোগ পাওয়ার নজির রয়েছে। এছাড়া প্রশ্নে মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থীদের জন্য গণিত বিষয় থাকায় বিপাকে পড়ে শিক্ষার্থীরা। দেশের প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষাতেই রয়েছে এ ধরনের নানা অসংগতি।

ভর্তি প্রক্রিয়ার জটিলতা ও ত্রুটির কারণে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়বে গ্রামের শিক্ষার্থীরা। আর্থিক সমস্যা, এইচএসসিতে উপযুক্ত পরিচর্যা ও দিকনির্দেশনার অভাবে এ বছর উচ্চশিক্ষায় ভর্তিতে গ্রামের শিক্ষার্থীরা পিছিয়ে পড়তে পারে। আর্থিক দৈন্যের কারণে গ্রামের শিক্ষার্থীদের অনেকেই কোচিংয়ে ভর্তি হতে পারে না। এছাড়া গ্রাম থেকে এসে শহরের পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতেও বেশ সময় লেগে যায়। ফল প্রকাশের কম সময়ের ব্যবধানে ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ায় এসব শিক্ষার্থী নানাভাবে শহরের শিক্ষার্থীদের চেয়ে পিছিয়ে পড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে গ্রামের শিক্ষার্থীরা যেহেতু তুলনামূলকভাবে কম কোচিংবিমুখ, তাই ভর্তি পরীক্ষায় তারা বেশি সাফল্য দেখাতে পারবে বলেও মনে করছেন কেউ কেউ।

সব সমস্যা মোকাবেলা করে যখন কোনো শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নেবে, সেখানেও রয়েছে শঙ্কা। বর্তমানে প্রশ্ন ফাঁস মহামারী আকার ধারণ করেছে। গত বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয়েই বিভিন্ন ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগ ওঠে। এর আগে মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁস হয়েছে- এমন অভিযোগ এনে তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলে শিক্ষার্থীরা। কখনও প্রশ্ন ফাঁস, কখনও ডিজিটাল জালিয়াতি মেধাবী শিক্ষার্থীদের অন্যতম দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে প্রথম সারির প্রতিষ্ঠানে ভর্তির জন্য শিক্ষার্থীদের কঠোর পরিশ্রমের পরেও পরীক্ষা নিয়ে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে রয়েছে শঙ্কা।






আপনার মতামত দিন

Your email address will not be published. Required fields are marked as *

*