Main Menu

অপদেবতার নাক

ভূমিকা

জাপানি মাস্টার ফিল্মমেকার আকিরা কুরোসাওয়া (২৩ মার্চ ১৯১০-৬ সেপ্টেম্বর ১৯৯৮)। বিশ্ব সিনেমার ইতিহাসের অন্যতম স্বতন্ত্র ও প্রভাববিস্তারী নির্মাতা। ৫৭ বছরের ক্যারিয়ারে নির্মাণ করেছেন ‘রশোমন’, ‘সেভেন সামুরাই’, ‘ড্রিমস’সহ ৩০টি মহাগুরুত্বপূর্ণ ফিল্ম। নিজ জীবনের একান্ত কথা তিনি জাপানি ভাষায় লিখে গেছেন যে গ্রন্থে, সেই আত্মজীবনীটির ইংরেজি অনুবাদ ‘সামথিং লাইক অ্যান অটোবায়োগ্রাফি’ প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৮০ দশকের শুরুতে। সেই গ্রন্থের পূর্ণাঙ্গ বাংলা অনুবাদ, ‘কুরোসাওয়া কথা’ শিরোনামে, ধারাবাহিকভাবে দেওয়া হচ্ছে এখানে। অনুবাদ করেছেন রুদ্র আরিফ।

গ্র্যাজুয়েশনের কাছাকাছি সময়ের ঘটনা। একটি ‘তাইশো স্কেটি’ চড়ে, আমাদের স্কুলের সামনের, হাত্তোরিজাকা নামের পাহাড়ি খাড়া রাস্তাটি ধরে নিচে নামছিলাম। সামনে এক চাকা আর পেছনে দুটি—প্রকাণ্ড একট স্কেটবোর্ড বা স্কুটারের মতো ছিল সেটি। এর ওপর নিজের ডান পা রেখে, হ্যান্ডেল আঁকড়ে ধরে, বাঁ পা দিয়ে এটিকে ঠেলে নিতে হতো। সামনের চাকাটি গ্যাস ঢেকে রাখা ধাতব ঢাকনিকে আঘাত করল; পাহাড় থেকে কাঁত হয়ে নামছিলাম আমি, জোর করে আটকে রেখেছিলাম দম। মনে হচ্ছিল, যেন আমি ডিগবাজি খাচ্ছি শূন্যে।

যখন জেগে উঠলাম, দেখি, হাত্তোরিজাকা পর্বতের নিচের পুলিশ বক্সটিতে শুয়ে আছি, স্ট্রেচারে। ডান হাঁটুতে মারাত্মক চোট পেয়েছিলাম এবং কিছুদিনের জন্য আমাকে আক্ষরিক অর্থেই পঙ্গু হয়ে থাকতে হলো। ফলে স্কুলে যাওয়া বন্ধ থাকল। [আমার ডান হাঁটুর অবস্থা এখনো খারাপ। হাঁটুটিকে সুরক্ষিত রাখতে গিয়ে, আমি বোধ হয় উল্টোটাই করে ফেলি :  প্রায়ই এটি দিয়ে কোনোকিছুতে ঠুস দিই, এটিকে আহত করি। এই হাঁটুটির কারণেই গলফ খেলায় আমি ভালো না। হাঁটু ভাঁজ করতে খুব কষ্ট হয় আমার, ফলে গলফের ময়দানে সবুজের বুকে থাকা তরঙ্গায়িত রেখাগুলো ঠিকঠাক আন্দাজ করতে পারি না। তা না হলে আমি যে এ খেলায় একজন দক্ষ হয়ে উঠতাম, সে ব্যাপারে সন্দেহ নেই।]

আমার পা ভালো হয়ে যাওয়ার পর, বাবার সঙ্গে একটা পাবলিক বাথহাউসে গিয়েছিলাম। সেখানে সাদা চুল ও সাদা দাড়িওয়ালা এক বয়স্ক ভদ্রলোকের সঙ্গে আলাপ হয় আমাদের। বাবা সম্ভবত তাকে চিনতেন; তার সঙ্গে কুশল বিনিময় করলেন। আমার উদোম গায়ের দিকে তাকিয়ে বুড়ো লোকটি বাবার কাছে জানতে চাইলেন, ‘তোমার ছেলে নাকি?’ বাবা মাথা নেড়ে সম্মতি জানালেন। ‘ওকে তো বেশ রোগাটে লাগছে। এই তো কাছেই একটা ফেন্সিং স্কুল খুলেছি আমি; ওকে পাঠিয়ে দিও।’ পরে যখন বাবার কাছে লোকটির পরিচয় জানতে চেয়েছিলাম, বাবা বলেছিলেন, এই লোকটি চিবা শুসাকুর নাতি।

চিবা শুসাকু ছিলেন সামন্ততান্ত্রিক শাসনামলের শেষভাগের এক বিখ্যাত ফেন্সার বা তরবারি-চালক; ওতামা-গা-ইকে একটা স্কুল ছিল তার, এবং তার রণনৈপুণ্য নিয়ে অনেক কাহিনী প্রচলিত রয়েছে। সেই মানুষটির নাতির স্কুল আমাদের বাড়ির কাছেই, এ কথা জেনে ফেন্সিং লেসনের প্রতি প্রলুব্ধ হয়ে উঠলাম। আর সোজা সেখানে যেতে শুরু করে দিলাম। কিন্তু সাদা চুল, সাদা দাঁড়িওয়ালা লোকটি, যাকে চিবা শুসাকুর নাতি বলা হতো—তিনি স্কুলটির সর্বোচ্চ আসনটি দখল করে রাখা ছাড়া আর কিছুই করেননি। আমাকে কোনো পাঠ দেওয়ার মতো আগ্রহ কোনোদিনই দেখাননি তিনি।

যিনি পাঠ দিতেন, তিনি ছিলেন এই মাস্টারের অ্যাসিস্ট্যান্ট, এবং তিনি লোকনাচের ভঙ্গিমা করে, ‘চো, চো, ইয়াত্তা! চো, ইয়াত্তা!’ বলে চিৎকার দিয়ে ওঠতেন। তার এই চিৎকারটিই কোনো-না-কোনোভাবে তাকে ভীষণ শ্রদ্ধা করা থেকে আমাকে নিবৃত্ত করেছে। সবচেয়ে বড় কথা, সেখানকার সব ছাত্রই ছিল আশপাশের এলাকার শিশু—যাদের কাছে ফেন্সিং ছিল এক ধরনের হাসি-তামাশার খেলার মতো, এবং এটি ছিল নিঃসন্দেহে ভীষণ ফালতু ব্যাপার।

আমাকে এ সমস্ত হতাশা গ্রাস করে ফেলেছে যখন, সে সময়ে ফেন্সিং স্কুলটির প্রধানকে ধাক্কা দিয়েছিল একটি মোটরগাড়ি—যা [মোটরগাড়ি] কিনা তখনো বেশ দুর্লভ বস্তুই ছিল। আমার কাছে এটি ছিল সামন্ততান্ত্রিক যুগের বিখ্যাত সোর্ডসম্যান মিয়ামোতো মুসাশির যেন নিজেরই ঘোড়ার লাথি খাওয়ার মতো ব্যাপার। ফলে চিবা শুসাকুর নাতির প্রতি যেটুকু শ্রদ্ধা অবশিষ্ট ছিল, এক নিমিষেই উবে গেল সব।

সম্ভবত চিবা স্কুলের অভিজ্ঞতার প্রতিক্রিয়া হিসেবেই, আমি ঠিক করে ফেললাম, নিজের শিল্পের ঝড়ে পুরো একটি প্রজন্মকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিলেন যে মানুষটি, সেই তাকানো সাজাবুরো পরিচালিত ফেন্সিং স্কুলটিতে গিয়ে পাঠ নেব। কিন্তু আমার সেই সিদ্ধান্তটি ‘তিন দিনের সন্ন্যাসী’র চেয়ে বেশি কিছু হয়ে উঠতে পারেনি। তাকানোর খ্যাতি আমি জানতাম, কিন্তু তার পাঠদানের সহিংসতার বাস্তবতা ছিল আমার কল্পনারও বাইরে।

থ্রাস্ট-অ্যান্ড-প্যারি প্র্যাকটিসে আমি চিৎকার করে ‘শয়তান!’ বলতাম আর থমকে দাঁড়াতাম। ওয়েইন্সকটের বিরুদ্ধে উড়ন্ত আক্রমণে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল আমাকে। আমার চোখের সামনে তখন নেমে এসেছিল আঁধার; সবকিছু যেন অগ্নিস্ফুলিঙ্গের মতো হাজারও নক্ষত্র হয়ে ছুটে বেড়াচ্ছিল! এই নক্ষত্রগুলোর মতোই, নিজের কেন্দো দক্ষতার ওপর আমার যা আত্মবিশ্বাস, কিংবা এটিকে ঘিরে আমার যা গর্ব—সব এক নিমেষে শূন্য আকাশে পাখির পালকের মতো উড়ে গেল!

হাজারও প্রবাদবাক্য ও লোকবিশ্বাস মাথায় ঘুরতে থাকল : ‘দুনিয়া কোনো ফুলের বিছানা নয়’, ‘সব বড়রও বড় আছে’, ‘ব্যাঙেরও দিন আসে’, ‘নলখাগড়ার ফাঁক দিয়ে ঘরের ছাদ দেখো’। আমাকে যখন দেয়ালের ওপর আছড়ে ফেলা হলো, তখন বেশ তিক্তভাবে উপলব্ধি করতে পারলাম, আমার পূর্ববর্তী ফেন্সিং মাস্টারের, একটা মোটরগাড়ির ধাক্কা খাওয়াকে কী দাম্ভিকতার সঙ্গেই না বিদ্রূপ করেছিলাম আমি! আমার লম্বা, পরিপাটি ‘অপদেবতার নাক’টি মুহূর্তেই ভেঙে গেল; সেটি আর কখনোই বেড়ে ওঠেনি।

তবে প্রাইমারি স্কুল থেকে গ্র্যাজুয়েশন করার আগমুহূর্তে শুধু কেন্দোই আমার অপদেবতার মতো নাকটির গর্বকে বিচূর্ণ করে দেয়নি। ফোর্থ মিডল স্কুলে ভর্তি হওয়ার আশা ছিল আমার। কিন্তু ভর্তি পরীক্ষায় পাস করিনি। কিন্তু ফার্স্ট মিডল স্কুলের ভর্তি পরীক্ষায় ভাইয়ার ফেল করার চেয়ে আমার ঘটনা ছিল আলাদা। আমার বেলায় কেউই অবাক হয়নি। এমনকি কুরোদা প্রাইমারি স্কুলে আমার যা রেজাল্ট, তাও ছিল যেমন-তেমন। যে সাবজেক্টগুলো পছন্দ করি, শুধু সেগুলোতেই আবেদন করেছিলাম আমি; যেমন—ব্যাকরণ, ইতিহাস, কম্পোজিশন, আর্ট ও পেনম্যানশিপ। এসব বিষয়ে আমাকে ছাড়িয়ে যাওয়ার মতো কেউ ছিল না। কিন্তু বিজ্ঞান ও পার্টিগণিত আমার ভালো লাগত না, এবং শুধু কোনোরকমে পাস করে যাওয়ার মতোই এনার্জি আমি এ ধরনের সাবজেক্টের পেছনে ব্যয় করেছি। ফলে রেজাল্টটি নিশ্চিত ছিল। ফোর্থ মিডল স্কুল পরীক্ষায় বিজ্ঞান ও পাটিগণিতের প্রশ্নগুলোর উত্তর দেওয়ার প্রচেষ্টায় একেবারেই ব্যর্থ হয়েছি আমি।

আমার শক্তিমত্তা ও দুর্বলতা এখনো একই রকম রয়ে গেছে। তার মানে, বিজ্ঞানমূলক বিষয়ের চেয়ে বরং সাহিত্যের সঙ্গেই আমি বেশি স্বস্তিবোধ করি। এর একটি উদাহরণ হলো, সংখ্যাগুলো আমি ঠিকঠাক লিখতে পারি না। লিখতে গেলে সেগুলো হয়ে যায় প্রাগৈতিহাসিক গুহাচিত্রের মতো দেখতে! ফলে গাড়ি চালানো শেখা তো কল্পনারও বাইরের বিষয়; কোনো সাধারণ স্টিল ক্যামেরাও আমি চালাতে, কিংবা এমনকি সিগারেট লাইটারে ফ্লুইডও ভরতে পারি না। আমার ছেলে আমাকে বলে, আমার টেলিফোন ব্যবহার করা দেখলে নাকি ওর মনে হয়, কোনো শিম্পাঞ্জি যেন ফোন করার চেষ্টা করছে!

কেউ যখন বারবার, বারংবার বলতেই থাকে—সে ‘এটাতে’ ভালো না, তখন সে আত্মবিশ্বাস আরো, আরো বেশি হারাতে হারাতে, সেটির ওপর একদম আস্থা হারিয়ে ফেলে। অন্যদিকে, যখন কাউকে বলা হয় সে ‘এটাতে’ ভালো, তখন তার আত্মবিশ্বাস বাড়তে বাড়তে একসময় সে সত্যিকার অর্থেই সেটাতে ভালো করে ফেলে। মানুষ যেহেতু জন্মগতভাবেই কিছু শক্তিমত্তা ও দুর্বলতা নিয়ে জন্মায়, ফলে পরবর্তীকালের অনুপ্রেরণার ওপর নির্ভর করে সেগুলোর তুখোড় ব্যবহার তার পক্ষে করা সম্ভব।

অবশ্য এ ধরনের অজুহাত খোঁজার এখন আর কোনো মানে হয় না; আর এ বিষয়টি আমার অবতারণা করার একমাত্র কারণ হলো এ কথা বলা—পরবর্তীকালে জীবনের যে পথ আমি বেছে নিয়েছিলাম, সেটি আমার কাছে স্পষ্ট ছিল। এ ছিল সাহিত্য ও শিল্পের পথ। এ পথ ধরে এখনো বহুদূর হেঁটে যাওয়ার আছে।

(চলবে)






আপনার মতামত দিন

Your email address will not be published. Required fields are marked as *

*